মো হারুন অর রশিদঃ
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৪ বার নির্বাচন করে মোট ২৩টি আসনের একটি আসনেও জীবনে হারেনি তিনি হচ্ছেন অপরাজিত কিংবদন্তি শহীদ প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়া পুতুল।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মূলধারায় এসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অটল থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পাওয়া বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের এক প্রতীক। এরশাদ আমলে ৮৫ দিন গৃহবন্দিত্ব, ১৯৯১-এর বিজয়, পরবর্তী সময়ে কারাবাস ও নানা নির্যাতনের মুখেও তিনি আপস করেননি, যা তাঁকে জনমানুষের হৃদয়ে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী আসনে বসিয়েছে। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে এসে তিনি এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলন গড়ে তোলেন। প্রলোভন ও গ্রেপ্তারের ভয় উপেক্ষা করে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে অটল ছিলেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় দলের অনেক নেতা দলত্যাগ করলেও খালেদা জিয়া সমঝোতা না করে দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, যা তাঁকে ‘আপসহীন’ উপাধি এনে দেয়। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু করা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় এবং পরবর্তী সময়েও নানা রাজনৈতিক সংকটে তিনি দেশত্যাগ না করে জনগণের সাথে থাকার কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন, যা তাঁর দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ।
আপসহীন এই নেত্রীর জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট। অবিভক্ত ভারত উপ-মহাদেশের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় জন্ম নেয়া বেগম খালেদা জিয়ার পারিবারিক নাম খালেদা খানম ডাকনাম পুতুল। পারিবারিকভাবে তার আরো নাম ছিল-টিপসি, শান্তি। বেগম জিয়ার তার ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন সনামধন্য ব্যবসায়ী। জনাব ইস্কান্দর মজুমদার ১৯১৯ সালে ফেনী থেকে জলপাইগুড়ির নয়াবস্তি এলাকায় যান। ইস্কান্দার মজুমদার সেখানে বোনের বাড়ী থেকে মেট্রিক পাস করেন। মা তৈয়বা বেগম ছিলেন একজন গৃহিনী। বেগম খালেদা জিয়ার আদিবাড়ী ছিলো ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায়। তিনবোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বোনরা ছিলেন, খুরশিদা জাহান হক (চকলেট আপা), সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং বেগম খালেদা জিয়া। দুই ভাই মেজর সাঈদ ইস্কান্দর ও শামিম ইস্কান্দর। বেগম খালেদা জিয়ার দুই সন্তান। তারেক রহমান যাকে ছোট্ট কালে সবাই আদর করে পিনো নামে ডাকত বলে জানা যায়। তিনি র্বতমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারর্পাসন, ছোট্ট ছেলে প্রয়াত আরফাত রহমান কোকো।
১৯৮১ সালের ৩ মে বিপদগামী কিছু সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে চট্টগ্রাম রেস্টহাউজে রাতে ঘুমের মধ্যে শহীদ করলে বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। তারপরও বেগম খালেদা জিয়া ধৈর্য্য না হারিয়ে ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে নেতা-কর্মীদের আহ্বানে বিএনপি দলীয় সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ১৯৮৪ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ও সেই বছর আগস্ট মাসে বিনা প্রতিন্ধিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথের নেত্রী হয়ে এরশাদ হঠাও এক দফা অন্দোলন শুরু করে। ১৯৯০ সালে ৪ ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। এরশাদের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একাটা গণতান্ত্রিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়ার পর ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর মাননীয় রাষ্ট্রপতি জনাব অব্দুর রহমান বিশ্বাস এর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়ীত্ব থেকে বিচারপতি সাহাবুউদ্দিন আহমদ পদত্যাগ করেন। সে বছরের নির্বাচনে বগুড়া ৭, ঢাকা ৫, ঢাকা ৯, ফেনী ১ ও চট্টগ্রাম ৮ মোট ৫টি আসনে নির্বাচন করে প্রতিটি আসনে জয় লাভ করে। কেবল ফেনীর ১ আসন রেখে বাকি ৪টি আসনে ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসে উপ-নির্বাচন দেন। সে বছর বেগম খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বেগম জিয়া বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, ফেনী-১, লক্ষীপুর-২, এবং চট্টগ্রাম -১ আসন থেকে মোট ৫টি আসনে নির্বাচন করে সব অসন থেকে জয়লাভ করে ফেনী ১ আসন রেখে বাকি ৪টি আসনে উপর্নিবাচন দেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালের ২১ র্মাচ ঢাকা পল্টন ময়দানে ৪ দলীয় জোট আহূত এক সমাবেশে শেখ হাসিনার সরকারকে আলটিমেটাম দিয়ে বলেন, ৩০ মার্চের মধ্যে পদত্যাগ করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়রে হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তখন সপ্তম সংসদের মেয়াদ ছিল ১৩ জুলাই ২০০১ সাল র্পযন্ত। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বিধান রয়েছে যে, মেয়াদ শেষে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে অনুসারে ১১ অক্টোবর ২০০১ তারিখের মধ্যে অষ্টম জাতীয় সংসদ র্নিবাচন অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক ছিল।
ইতপূর্বে বাংলাদেশে কোনো সংসদের মেয়াদ কাল পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনাই। ১ অক্টোবর ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন অষ্টম সংসদে ৩০০টি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে জয়লাভ করেন। ২০০১ সালের সেই নির্বাচনে ও বেগম খালেদা জিয়া ৩টি আসনে নির্বাচন করেন তিনটি আসনেই জয় লাভ করেন। জীবনে বেগম খালেদা জিয়া কোনো নির্বাচনে হারার প্রমাণ নাই।
২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকা কালিন বিরোদী দল অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করার পর ও বেগম খালেদা জিয়াকে পরাজিত করতে না পারলেও ২০০৬ সালের অক্টোবরে প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ নিয়ে ততকালিন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে ২০০৬ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ততকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে পদত্যাগ করে। রেডিও টেলিভিশনে ভাসন দেওয়ার সাথে-সাথে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের তান্ডবে তীব্র রাজনৈতিক সংকট সহিংসতা ও লগি-বৈঠা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জামায়াত বিএনপির ৬ জন নেতা কর্মীকে হত্যার মাধ্যমে দেশে তাণ্ডব সৃষ্টিসহ একটি কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত করেন। এরপর ২৮ অক্টোবর বিরোধী দল পল্টনে সমাবেশ করে অন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে একটি অরাজকতা সৃষ্টি করেন। ২৯ অক্টোবর ২০০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রীসভা বিলুপ্ত করে। তখন অকল্পনিয় সংঘর্ষ ও দেশে অস্তিতিশীল অবস্থতা বিরাজের পরও বড় দুই দলের মহা-সচিব আওয়ামী লীগের অব্দুল জলিল ও বিএনপির আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া বার-বার সংলাপের বসার পরও ব্যার্থ হয়। একদিকে সংলাপ অন্যদিকে ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের প্রচারণা।
সে সময় ১১ জানুয়ারি সরকার দল ও বিরোধী দলের বাঘা-বাঘা নেতাদের ঢাকা কানাডিয়ান হাই-কমিশনারের বাসায় ইউরোপিয় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের পাশাপাশি আমেরিকার রাষ্ট্রদূত এবং ভারতের হাই কমিশনার ও উপস্তিত থেকে বৈঠক করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তাবিধসহ সারাদেশের মানুষের জল্পনা কলাপনা চলছিল সারাদিন। সে দিন উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙ্গেদিয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। পরর্বতীতে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুসকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান হওয়ার প্রস্তাব করলেও ড. ইউনুস উক্ত প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ততকালিন বিশ্ব ব্যাংক কর্মকর্তা ড. ফখরুদ্দিন আহাম্মদ এগিয়ে অসেন।
ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ জেনারেল মঈন ইউ আহমেদকে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর একটি জাতীয় নির্বাচন করেন। সে নির্বাচনে বিএনপিকে মাত্র ৩০টি আসন দিলেও সে প্রহসনের নির্বাচনেও বেগম জিয়া ৩টি আসন থেকে নির্বাচন করে প্রতিটি আসন লাভ করেন। সে তিনটি আসন হচ্ছে যথাক্রমে:-বগুড়া-৬ বগুড়া-৭ ও ফেনী ১ আসন। ২০১৮ সালেও তিনি নির্বাচন করার জন্য ফেনী ১, বগুড়া ৬ ও বগুড়া ৭ আসনে মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়ে ছিলেন কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কারণে মামলার জটিলতা দেখিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হলে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। তখন ও মানুষ বলাবলি করেছে বেগম জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারলে যতটি আসন থেকে নির্বাচন করত ততটি আসনেই জয় লাভ করত।
বলা বাহুল্য ২০০৭ সালের সেই এক এগার ভয়ঙ্কর পরিস্তিতিতে বেগম জিয়াকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের পর বেগম জিয়ার দুইটি সন্তানকে হাজারো র্নিযাতনের পরও বেগম জিয়াকে দেশ ত্যাগের জন্য রাজি করতে পারেনা। সে আপোষহীন জননেত্রী আমাদের নিকট থেকে ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোর ৬টার সময় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, বরং তিনি গণতন্ত্র রক্ষা এবং আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে আদর্শ ও মূল্যবোধ লালন করেছেন, তা হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে চলাই হবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়।
কোনো নেতাকে কেবল স্লোগান বা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা প্রকৃত সম্মান নয়। বেগম খালেদা জিয়া যে সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করাই হলো তাঁর প্রতি আসল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। তাঁর আদর্শগুলো আমাদের চিন্তা ও কর্মে প্রতিফলিত হলে দেশ ও জাতি আরও শক্তিশালী হবে। তাঁর নির্দেশিত পথে সততা ও সাহসের সাথে পথ চলাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য।
লেখক: এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী, সহ সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম, মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন,পরিষদ,উখিয়া,কক্সবাজার।
মন্তব্য করুন