একজন মা। দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেছেন। নিজের সুখ-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেছেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করেছেন। সেই মায়ের জীবনের শেষ অধ্যায়টি কি এমন হওয়ার কথা ছিল?
রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটে এক বৃদ্ধা মায়ের মরদেহ পড়ে ছিল দিনের পর দিন। জীবনের সমস্ত দায়িত্ব শেষ করে, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করে, পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর খবর জানারও কেউ ছিল না। সাত দিন ধরে নিঃসঙ্গ একটি ফ্ল্যাটে পড়ে ছিল তাঁর নিথর দেহ। এই দৃশ্য শুধু একটি মৃত্যুর গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক নির্মম বাস্তবতা।
আমরা প্রায়ই বলি, “শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।” কিন্তু এই ঘটনা যেন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—কোন শিক্ষা? যে শিক্ষা মানুষকে বড় পদে বসায়, কিন্তু মায়ের খোঁজ নিতে শেখায় না? যে শিক্ষা ডিগ্রি দেয়, কিন্তু দায়িত্ববোধ জাগাতে পারে না? যে শিক্ষা মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু মানবিকতা শেখাতে ব্যর্থ হয়?
প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড নয়; সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।
সুশিক্ষা মানুষকে শুধু জ্ঞানী করে না, তাকে মানুষও করে। সুশিক্ষা শেখায় বয়স্ক মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে, তাদের একাকীত্ব বুঝতে, তাদের চোখের ভাষা পড়তে। সুশিক্ষা শেখায় যে বৃদ্ধ মা-বাবা কোনো বোঝা নন; তারা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি।
ইসলাম মা-বাবার মর্যাদাকে এমন উচ্চতায় স্থান দিয়েছে, যা অন্য কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, মা-বাবার প্রতি ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ না করতে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ঘোষণা করেছেন, “জান্নাত মায়ের পদতলে।” এই শিক্ষাই প্রমাণ করে, একজন মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কতটা গভীর ও পবিত্র।
আজ আমরা আধুনিকতার গর্ব করি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ নিয়ে কথা বলি। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবারগুলো ছোট হচ্ছে, সম্পর্কগুলো দূরে সরে যাচ্ছে, আর অনেক মা-বাবা জীবনের শেষ বয়সে একাকীত্বের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক সফলতা, উচ্চশিক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদা তখনই অর্থবহ, যখন তার ছায়ায় মা-বাবা নিরাপত্তা, সম্মান ও ভালোবাসা পান।
একটি জাতির সভ্যতা বিচার করা যায় তার বৃদ্ধদের প্রতি আচরণ দেখে। যে সমাজে বৃদ্ধ মা-বাবা অবহেলিত হন, সে সমাজ যত উন্নতই হোক, সেখানে মানবিকতার ঘাটতি থেকেই যায়।
সাত দিন ধরে পড়ে থাকা সেই মায়ের মরদেহ আমাদের কাছে শুধু একটি সংবাদ নয়; এটি একটি প্রশ্ন, একটি সতর্কবার্তা এবং একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা নিজেদের দেখতে পারি কি? আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত, নাকি শুধু সনদধারী?
আজ প্রয়োজন নতুন করে ভাবার। সন্তানদের শুধু সফল নয়, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার। পরিবারে দায়িত্ববোধ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও নৈতিকতার শিক্ষা ফিরিয়ে আনার। কারণ ডিগ্রি একজন মানুষকে চাকরি দিতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষা তাকে মানুষ করে।
যে জাতি তার মা-বাবাকে সম্মান করতে শেখে না, সে জাতি কখনো প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। তাই আবারও বলতে হয়—
“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড নয়, সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।”
মন্তব্য করুন